আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি করা একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলমান সংঘাতের ফলে তৈরি হওয়া আর্থিক ক্ষতি ১৯৮০ সালের পর থেকে এ অঞ্চলের সব বড় ভূরাজনৈতিক সংকটকে ছাড়িয়ে গেছে। এর আগে হওয়া ইরান-ইরাক যুদ্ধ, কুয়েতে ইরাকের আগ্রাসন কিংবা ২০১১ সালের আরব বসন্তের চেয়েও এবারের ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি বিস্তৃত ও গভীর। খবর আরব নিউজ।
আশারক বিজনেস ও ব্লুমবার্গের যৌথ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৪০-এর দশকের পর এ প্রথম কোনো একক সামরিক সংঘাত সরাসরি অঞ্চলের ১০টি দেশের অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, ওমান, ইরাক, লেবানন ও ইসরায়েল। এ ১০টি দেশের সম্মিলিত জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ কোটি ডলার। এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার মোট অর্থনীতির প্রায় ৭০ শতাংশ এবং বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ৩ শতাংশের সমান।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭৩ সালের আরব তেল অবরোধের পর এ যুদ্ধকে অঞ্চলের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট বা পরিবর্তনের মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ১৯৭০-এর দশকের সংকটের সঙ্গে এবারের পরিস্থিতির একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। সে সময় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় উপসাগরীয় দেশগুলো বিপুল সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ পুরো অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে সিরিয়া, লেবানন ও সুদানের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে যে বিশাল পুনর্গঠন কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল, তা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
যুদ্ধের কারণে পুরো অঞ্চলে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও গ্যাস উৎপাদন এবং রফতানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। মে মাসে ওপেকভুক্ত দেশগুলোর জ্বালানি তেল উৎপাদন ১৯৮৫ সালের পর সর্বনিম্ন স্তরে নেমে গেছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর ইরানের অর্থনীতি প্রায় ৬ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।
এ চরম সংকটের মধ্যেও সৌদি আরবের অর্থনীতি বেশ স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে। অতীতের সংকটের মতো এবারো দেশটি নিজেদের জ্বালানি তেল রফতানি স্বাভাবিক রাখতে পেরেছে। ঝুঁকি এড়াতে সৌদি আরামকো অপরিশোধিত জ্বালানি তেল হরমুজ প্রণালির পরিবর্তে ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে সরিয়ে নিয়েছে। ফলে ২০২৬ সালে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধাক্কা সামলে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি কতটা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে তা নির্ভর করছে যুদ্ধ কত দ্রুত শেষ হচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো পুরোপুরি সচল হচ্ছে কিনা তার ওপর। তেল-গ্যাস খাত হয়তো দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে, কিন্তু পর্যটন, বিদেশী বিনিয়োগ ও শিপিং খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এ অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি বজায় রাখা অপরিহার্য।